আওয়ামীলীগের রাজনীতি থেকে বিএনপির মন্ত্রীপরিষদ, নুরুল হক নুরের উথ্যানের গল্প।

শেয়ার করুন

কেউ বলে বিকাশ নুর আবার কেউ বলে পিপিনুল, তার বাবা বলেন শেখ মুজিবের পরেই তার অবস্থান। যে ব্যক্তি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অন্যতম কঠোর সমালোচক হয়ে উঠলেন, তাঁর নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগ দিয়ে—কেন এবং কীভাবে সেই পরিবর্তন ঘটল?, আজ আমরা তার পারিবারিক এবং রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

নুরুল হক নুর ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রবাসী কল্যান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কর্মরত।

নুরুল হক নুর ১৯৯১ সালে পটুয়াখালীর চর বিশ্বাস ইউনিয়নে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা ফরিয়া ব্যবসায়ি এবং ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ইদ্রিস হাওলাদার এবং মা নিলুফা বেগম একজন গৃহিণী। ৮ ভাইবোনের মধ্যে নুরুল হক ৪র্থ।

ছোটবেলা থেকেই খুব সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন নুরুল হক নুর। মাত্র আড়াই বছর বয়সেই মাকে হারান তিনি। বড় একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা নুরের জীবনে বাবার প্রভাব ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বাবা ইদ্রিস হাওলাদার ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যও ছিলেন।

তবে নুরুল হক নূরের রাজনৈতিক পরিচয়ের শুরুটা কিন্তু গণঅধিকার পরিষদ কিংবা কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকের পরিচয় ছিল ছাত্রলীগের সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৫ সালে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রলীগের কমিটিতে তিনি উপ-মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক পদেও ছিলেন। অর্থাৎ যে ছাত্রলীগ পরবর্তীতে তাঁর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, সেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেই একসময় তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল।

কিন্তু এরপরই আসে বড় পরিবর্তন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে সরে এসে নুর যুক্ত হন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন নুরুল হক নুর।

আন্দোলনের সময় একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর ওপর। হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতা নন, জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।

২০১৯ সালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে আরও বড় সাফল্য।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে নুরুল হক নুর ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ছাত্রলীগের তৎকালীন প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে পরাজিত করে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন।

ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁকে সক্রিয় দেখা যায়।

তবে ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযোগ কম ওঠেনি।

২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রোকেয়া হলের প্রভোস্টকে লাঞ্ছিত করা এবং ভাঙচুরের অভিযোগে নুরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। যদিও নুরুল হক নুর এসব অভিযোগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। এখানে মনে রাখা দরকার, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।

এরপর নুরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ২০২১ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের একটি অংশকে নিয়ে গড়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক দল—গণঅধিকার পরিষদ। দলটির সঙ্গে যুক্ত হন নুরুল হক নুর এবং ড. রেজা কিবরিয়াসহ আরও কয়েকজন পরিচিত মুখ।

শুরুতে নুর ও রেজা কিবরিয়াকে একই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের দুই গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দেখা হলেও খুব বেশি সময় পর তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

একপর্যায়ে দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয়। রেজা কিবরিয়া নুরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে নুরও রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন।

শেষ পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

আর এখান থেকেই নুরুল হক নুরকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়—যে নেতা দুর্নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলে রাজনীতিতে এসেছিলেন, তাঁর নিজের দলের ভেতরেই কেন এত বড় বিরোধ তৈরি হলো?

এর মধ্যেই নুরুল হক নুরকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক বিতর্কগুলোর একটি সামনে আসে।

ইসরায়েলি নাগরিক মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগপন্থী মহল থেকে নুরের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। তবে নুরুল হক নুর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ওই বৈঠক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ও অন্য পক্ষের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

অর্থাৎ এই ঘটনার ক্ষেত্রেও অভিযোগ এবং প্রমাণিত সত্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

এরপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনের সময় নুরুল হক নুর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

কিন্তু আন্দোলনের মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতা, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয়। নুরের পক্ষ থেকে এসব মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে দাবি করা হয়।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে বড় পরিবর্তন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। আর যে নুরুল হক নুর এতদিন রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, তাঁর সামনে খুলে যায় জাতীয় রাজনীতির নতুন দরজা।

২০২৪ সালের পর গণঅধিকার পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনও পায়। এরপর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর।

আর এখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটে।

একসময় যিনি ছিলেন রাজপথের সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ, তিনিই এবার হয়ে গেলেন সরকারের অংশ।

বর্তমানে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থাৎ একজন ছাত্রলীগকর্মী থেকে কোটা আন্দোলনের নেতা, সেখান থেকে ডাকসুর ভিপি, এরপর রাজনৈতিক দলের নেতা, বিরোধী আন্দোলনের কর্মী এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতিমন্ত্রী—নুরুল হক নূরের রাজনৈতিক পথচলা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক উত্থানের গল্প।

তবে তাঁর গল্প এখানেই শেষ নয়।

তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা, রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ।

কিন্তু এসব অভিযোগের কতগুলো সত্য, কতগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণা, আর কোন অভিযোগের পেছনে আসলে কী প্রমাণ রয়েছে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আর নুরুল হক নূরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এটাই—

যে ব্যক্তি একসময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, আজ তিনি নিজেই সেই রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ। তাহলে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ কি বদলেছে, নাকি ক্ষমতার ভেতরে থেকেই তিনি তাঁর সেই পরিবর্তনের রাজনীতি বাস্তবায়ন করতে চাইছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *