জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়ল: আন্তর্জাতিক বাজার নাকি নীতিগত ব্যর্থতা? জনজীবনে কতটা প্রভাব পড়বে

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন যেন ক্রমশ একটি অদৃশ্য করের বোঝার নিচে চাপা পড়ছে। বাজারে গেলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, বিদ্যুতের বিল বাড়ে, পরিবহন ভাড়া বাড়ে। আর এখন সেই চাপের নতুন নাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি।

সরকার জুন মাসের জন্য আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। প্রতি লিটার পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা। ডিজেলের দাম আপাতত ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।  

প্রশ্ন হচ্ছে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন কেন হলো? এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী? আর এর চূড়ান্ত মূল্য কে দেবে?

উত্তরটি সহজ, সরকার নয়, জনগণ।

এপ্রিলের ধাক্কার পর জুনের নতুন আঘাত

বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গত ১৮ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক দফায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকায়, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকায়, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকায় উন্নীত হয়।  

মে মাসে সেই দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও জুনে আবার নতুন করে ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ছয় সপ্তাহে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৪ টাকা, অকটেন বেড়েছে ২৫ টাকা এবং কেরোসিন বেড়েছে ২৩ টাকা।  

এটি কেবল একটি মূল্য সমন্বয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির একটি বাস্তব চিত্র।

সরকারের যুক্তি: আন্তর্জাতিক বাজার

সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার অধীনে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয় বিবেচনা করে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করা হয়।  

কাগজে-কলমে যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশীয় বাজারেও চাপ তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে কি একই গতিতে জনগণ তার সুফল পায়?

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তরটি সবসময় ইতিবাচক নয়।

ইরান সংকট থেকে ঢাকার বাজার

বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেল পরিবহনের রুটে অনিশ্চয়তা, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির সময় এই কারণগুলোকেই প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল।  

অর্থাৎ ঢাকার পাম্পে দাঁড়িয়ে একজন মোটরসাইকেল চালক যে অতিরিক্ত ৫ টাকা দিচ্ছেন, তার পেছনে রয়েছে হাজার মাইল দূরের ভূ-রাজনীতি।

কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ভূ-রাজনীতির ব্যাখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—মাস শেষে তার পকেটে কত টাকা অবশিষ্ট থাকে।

ডিজেলের দাম না বাড়লেও কেন বাড়বে সবকিছু?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

শুনতে স্বস্তিদায়ক।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের বড় অংশ ডিজেলচালিত হলেও পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন খাত, রাইড-শেয়ারিং, ছোট যানবাহন, মোটরসাইকেলনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শহুরে সেবার ব্যয় বাড়াবে।  

ফলে বাজারে সবজির দাম বাড়ুক বা না বাড়ুক, ডেলিভারি চার্জ বাড়বে।

পণ্য পরিবহন খরচ না বাড়লেও ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধির মনস্তাত্ত্বিক সুযোগ নেবেন।

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলো জ্বালানির দাম বাড়লে সবকিছুর দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু জ্বালানির দাম কমলেও খুব কম পণ্যের দাম কমে।

কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি: গ্রামবাংলার জন্য নীরব বিপদ

শহরে বসে অনেকে কেরোসিনকে গুরুত্বহীন ভাবতে পারেন।

কিন্তু দেশের বহু গ্রামীণ এলাকায় এখনও কেরোসিনের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎবিহীন বা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহপ্রাপ্ত অঞ্চলে।

কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় উন্নীত হওয়া মানে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন চাপ।  

এই চাপ সংবাদ শিরোনামে আসে না।

কিন্তু সংসারের খাতায় স্পষ্টভাবে লেখা থাকে।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ?

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়ছে।

খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে।

এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের পুনঃপুন মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে নতুন মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত পরিবহন ব্যয় ও খাদ্যপণ্যের দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।  

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন”।

জনগণের ভাষায় এর নাম “বাজারে আগুন”।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বোঝা ভাগাভাগি হবে কবে?

সরকার বলছে, ভর্তুকি দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

দুই পক্ষের বক্তব্যেই যুক্তি আছে।

কিন্তু সেই যুক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির প্রশ্ন একটাই—

কেন প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটের চূড়ান্ত মূল্য তাকেই দিতে হবে?

ডলারের দাম বাড়লে সে দেয়।

গ্যাসের দাম বাড়লে সে দেয়।

বিদ্যুতের দাম বাড়লে সে দেয়।

জ্বালানির দাম বাড়লেও তাকেই দিতে হয়।

কিন্তু তার আয় কি একই হারে বাড়ে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

উপসংহার

জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল ৫ টাকার হিসাব নয়। এটি এমন এক অর্থনৈতিক সংকেত, যা বলছে বৈশ্বিক অস্থিরতার বোঝা এখন আরও সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপছে।

সরকারের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি সেই ব্যবস্থার সঙ্গে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি না হয়, তবে প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত জনজীবনের ওপর নতুন চাপ হয়ে ফিরে আসবে।

আর তখন প্রশ্নটি অর্থনীতির নয়, ন্যায়বিচারের হয়ে দাঁড়াবে।

কারণ জ্বালানির দাম বাড়ে পাম্পে, কিন্তু তার আগুন লাগে মানুষের রান্নাঘরে।

লেখক: মো: সাব্বির আহমেদ (নির্বাহী সম্পাদক, গণ আওয়াজ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *