গণ আওয়াজ প্রতিবেদন
দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। একটি সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের চারটি ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকার আর্থিক চাপ বা তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ, স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের তুলনায় এই ব্যাংকগুলোর ঘাটতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল চারটি ব্যাংকের সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ কেলেঙ্কারির ফলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছর ধরে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো, বিশেষ তারল্য সহায়তা এবং গ্যারান্টি স্কিমের মাধ্যমে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে অর্থ জুগিয়েছে। citeturn0search2turn0search5
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ আত্মসাতের সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এর ফলে অনেক ব্যাংকের কাগজে-কলমে সম্পদ থাকলেও বাস্তবে নগদ অর্থের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো আমানতকারীদের আস্থা। অতীতে কয়েকটি ব্যাংকে অর্থ উত্তোলন নিয়ে আতঙ্ক দেখা দেওয়ার পর গ্রাহকদের একটি অংশ নিরাপদ বিবেচিত ব্যাংকগুলোর দিকে ঝুঁকেছেন। এতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা ও সহায়তা দিতে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অর্থ সহায়তা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, ঋণ জালিয়াতির বিচার, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কার্যকর পুনর্গঠন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। অন্যথায় সংকট আরও গভীর হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। চারটি ব্যাংকে ৬৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকার তারল্য সংকটের তথ্য শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দায়হীনতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার অবক্ষয়ের একটি সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং ব্যাংক খাতকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় কি না।
সূত্র: আজ প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পর্কিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন।
