অস্ট্রেলিয়ার ল্যাকেম্বায় ৪০০ কোটির বাণিজ্য; বিশ্বজুড়ে ইফতার বৈচিত্র্য, মধ্যপ্রাচ্যের কুনাফা, উটের বার্গার ও বাঙালির জিলাপি-হালিমের স্বাদ এখন বিশ্বময়।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে যখন সন্ধ্যা নামে, ল্যাকেম্বার হ্যালডন স্ট্রিট হয়ে ওঠে এক টুকরো ছোট পৃথিবী। বিশ্বজুড়ে ইফতার বৈচিত্র্য। লাখো মানুষের ভিড়, উটের বার্গারের ম ম গন্ধ আর বাঙালির চিরায়ত জিলাপি-বেগুনির স্বাদ—সব মিলিয়ে ‘রামাদান নাইটস ল্যাকেম্বা’ এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, সৌদি আরব থেকে নাইজেরিয়া কিংবা তুরস্ক থেকে মালদ্বীপ—বিশ্বের ২০০ কোটি মুসলিমের ইফতার টেবিলে কী এমন জাদু আছে যা ইউনেস্কোকেও স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করল? চলুন জেনে নিই দেশে-বিদেশের ইফতার সংস্কৃতির রোমাঞ্চকর তথ্য।
ল্যাকেম্বার রামাদান নাইটস: সিডনিতে মুসলিম সংস্কৃতির মিলনমেলা
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ল্যাকেম্বা এলাকাটি পবিত্র রমজান মাসে এক অনন্য রূপ ধারণ করে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে এখানে।
‘রামাদান নাইটস ল্যাকেম্বা’ শুধু ইফতারের জন্যই নয়,
বরং এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং রাতের বাজারের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।
ল্যাকেম্বার হ্যালডন স্ট্রিটে প্রতি বৃহস্পতি থেকে রবিবার পর্যন্ত চলে এই উৎসব।
সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাজারো মানুষ এখানে সমবেত হন রমজানের পবিত্রতা ও উষ্ণতা উপভোগ করতে।
ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন এই উৎসবে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের সমাগম হয়।
এক মাসে এখানে বাণিজ্য হয় প্রায় চারশ কোটি টাকার।
এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হলো উটের মাংস দিয়ে তৈরি ‘ক্যামেল বার্গার’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘কুনাফা’।
সিডনির মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এটি এখন একটি আত্মিক ও সামাজিক বন্ধনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বাঙালি ইফতারের বৈশ্বিক জয়যাত্রা
ল্যাকেম্বার রামাদান নাইটসেও বাঙালি ইফতারি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
প্রবাসের মাটিতে বসেও বাংলাদেশি শেফরা চেষ্টা করেন দেশের আসল স্বাদ ধরে রাখতে।
গরম গরম পেঁয়াজু, মুচমুচে বেগুনি, জিলাপি এবং শাহী হালিমের সুবাস প্রবাসীদের মনে করিয়ে দেয় এক টুকরো বাংলাদেশ।
স্থানীয় বাংলাদেশি শেফ মোহাম্মদ আলীর মতে, এই খাবারগুলো শুধু ক্ষুধা মেটায় না, বরং প্রবাসীদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
বাঙালি ইফতারির বৈচিত্র্য আজ সিডনি ছাড়িয়ে লন্ডন, নিউইয়র্ক এবং টরন্টোতেও সমান জনপ্রিয়।
ছোলা-বুট, মুড়ি মাখা আর আলুর চপ ছাড়া যেমন বাঙালির ইফতার অপূর্ণ, তেমনি ল্যাকেম্বার উৎসবে আসা ভিন্ন দেশি নাগরিকরাও এখন এই ভাজাপোড়া খাবারের প্রেমে পড়েছেন।
বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের কদর এখন বিশ্বজনীন।
মধ্যপ্রাচ্যের কুনাফা ও উটের বার্গারের জনপ্রিয়তা
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টান্ন কুনাফা এখন ল্যাকেম্বার উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষ ধরনের নুডলস, পনির এবং চিনির সিরাপ দিয়ে তৈরি এই মিষ্টান্নটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।
লেবানন বা সিরিয়ার বাসিন্দাদের কাছে এটি রমজানের এক অনন্য অনুষঙ্গ।
অন্যদিকে, উটের মাংস দিয়ে তৈরি ‘ক্যামেল বার্গার’ বিশেষ করে মাংসপ্রেমীদের জন্য এক বিশাল আকর্ষণ।
সম্পূর্ণ হালাল পদ্ধতিতে তৈরি এই বার্গার খেতে সিডনির দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
দেশভেদে ইফতারের বৈচিত্র্য: এশিয়া থেকে আফ্রিকা
বিশ্বের ২০০ কোটি মুসলমানের ইফতারের ধরণ দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়।
যদিও খেজুর এবং পানি দিয়ে রোজা ভাঙা সুন্নাহ, কিন্তু এরপরের আয়োজনে থাকে ব্যাপক ভিন্নতা।
উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ায় একে বলা হয় ‘বুকা পুয়াসা’।
সেখানে মিষ্টি পানীয় এবং ‘ওন্দে ওন্দে’ নামক নারকেল মিশ্রিত বিশেষ বড়ি দিয়ে ইফতার করা হয়।
অন্যদিকে মালদ্বীপে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘কুলহি বোয়াকিবা’, যা মূলত মাছ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঝাল পিঠা।
পাকিস্তানি ইফতারে মাংস ও রুটির প্রাধান্য থাকে বেশি।
শামি কাবাব, তন্দুরি কাটলেট এবং টিক্কার পাশাপাশি তাদের জনপ্রিয় পানীয় হলো ‘রুহ আফজা’।
ভারতে রাজ্যভেদে ইফতারের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
হায়দ্রাবাদে হালিম জনপ্রিয় হলে কেরালা ও তামিলনাড়ু অঞ্চলে ‘নমবু কাঞ্জি’ নামক মাংস ও চালের জাউ জাতীয় খাবার দিয়ে ইফতার করা হয়।
সৌদি আরব ও তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী স্বাদ
সৌদি আরবে ইফতারের শুরুটা হয় ‘গাহওয়া’ নামক অ্যারাবিক কফি এবং উন্নত মানের খেজুর দিয়ে।
এরপর তারা ‘থারিদ’ (ভেড়ার মাংস ও সবজির স্যুপ) বা ‘খাবসা’র মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে।
তুরস্কের ইফতার টেবিলে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘রামাজান পিদেসি’, যা বিশেষ এক ধরনের রুটি।
এছাড়াও তুর্কিরা জলপাই এবং ৪১ রকমের মশলা দিয়ে তৈরি বিশেষ শরবত পান করতে পছন্দ করেন।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও ইফতারের সামাজিক গুরুত্ব
ইফতার আয়োজনের এই অনন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে ২০২৩ সালে ইউনেস্কো ইফতারকে ‘বিশ্বের অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইফতার শুধু একটি খাবারের সময় নয়, এটি সমাজে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব এবং ত্যাগের শিক্ষা দেয়।
পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিয়ে একসঙ্গে ইফতার করা মুসলিম বিশ্বের এক চিরন্তন রীতি যা হাজার বছর ধরে চলে আসছে।
বিশ্বজুড়ে রমজানের এই অনন্য উৎসব সম্পর্কে আপনার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে কি?
কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান এবং এই বৈচিত্র্যময় তথ্যগুলো শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে।
