রমজানের বৈচিত্র্যময় বিশ্ব ঐতিহ্য: ঢোল, কামান আর মানুষের বিশ্বাস

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রমজান পালনের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের একটি কোলাজ চিত্র।
শেয়ার করুন

তুরস্কের ঢোলবাদক থেকে মিশরের ফানুস; রমজানের বৈচিত্র্যময় বিশ্ব ঐতিহ্য, জানুন অন্যান্য ধর্মের উপবাসের সাথে ইসলামের রোজার পার্থক্য ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।

রমজানের বৈচিত্র্যময় বিশ্ব ঐতিহ্য

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজান মানেই কেবল রোজা রাখা নয়, বরং হাজার বছরের ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ।

রমজানের বৈচিত্র্যময় বিশ্ব ঐতিহ্য।

কোথাও কামানের গোলার শব্দে ইফতার হয়, কোথাও বা শিশুরা গান গেয়ে মিষ্টি সংগ্রহ করে।

কিন্তু আপনি কি জানেন, রোজা শুরুর আদি ইতিহাস কী ছিল?

কেনই বা খ্রিষ্টানদের ‘লেন্ট’ বা হিন্দুদের ‘একাদশী’ থেকে আমাদের রোজা আলাদা?

রমজানের বিস্ময়কর সব গ্লোবাল ঐতিহ্য এবং এর বিবর্তনের রোমাঞ্চকর কাহিনী জানুন আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে।

ঢোল-তলোয়ারের গর্জন থেকে লণ্ঠনের আলো ও ইতিহাসের বিবর্তন

রমজান কেবল একটি মাস নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস

এবং হাজার বছরের সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা।

আরবি বর্ষপঞ্জিকার নবম মাস হিসেবে রমজানে বিশ্বের প্রতিটি কোণেই মুসলিমরা রোজা পালন করেন।

তবে এই পালনের ধরণে রয়েছে বিশাল ভিন্নতা।

কোথাও ঢোল পিটিয়ে সেহরিতে জাগানো হয়, কোথাও বা কামানের তোপধ্বনিতে জানানো হয় ইফতারের সময়।

আবার ইসলাম ছাড়াও খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম কিংবা ইহুদি ধর্মেও রয়েছে উপবাসের বিচিত্র ইতিহাস।

আজ আমরা জানব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনন্য রমজান রীতি

এবং কীভাবে এই রোজা আজকের অবস্থানে এলো তার ঐতিহাসিক বিবর্তন।

১. ইন্দোনেশিয়ার পাদুসান (Padusan)

রমজান শুরুর আগে নিজেদের পবিত্র করতে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মুসলমানরা প্রাকৃতিক ঝরনা বা পুলে গোসল করার মাধ্যমে পাদুসান রীতি পালন করেন।

২. সেহরিতে জাগানোর বিচিত্র পদ্ধতি: তুরস্ক থেকে মরক্কো

তুরস্কের মেসাহারাতি (Mesaharaty)

সেহরির সময় মানুষকে জাগাতে অটোমান আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ঢোল (Davul) বাজিয়ে গান গাওয়ার রীতি আজও তুরস্কে জনপ্রিয়।

তুরস্কে আজও অটোমান আমলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ‘দাভুল’ (এক ধরণের বড় ঢোল) পিটিয়ে সেহরির সময় জানান দেওয়া হয়।

বিনিময়ে ঢোলবাদকরা বখশিস পান।

অনেকটা একই প্রথা দেখা যায় মিশর ও জর্ডানে, যেখানে তাদের বলা হয় ‘মেসাহারাতি’।

মরক্কোতে ‘নাফারস

মরক্কোতে এই বিশেষ ব্যক্তিদের বলা হয় ‘নাফারস’,

যারা ঐতিহ্যবাহী গান্দোরা পোশাক এবং টুপি পরে প্রার্থনার সুরে রাস্তা ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন।

৩. লেবাননের মিডফা আল-ইফতার

লেবানন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইফতারের সময় জানান দিতে কামানের তোপধ্বনি বা ‘মিদফা আল ইফতার’ (Midfa Al-Iftar) ব্যবহার করা হয়।

প্রায় ২০০ বছর আগে মিশরে ঘটনাক্রমে শুরু হওয়া এই রীতি এখন মধ্যপ্রাচ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৪. কামানের তোপধ্বনি ও লণ্ঠনের উৎসব

অন্যদিকে মিশরের ‘ফানুস’ বা রঙিন কাঁচের লণ্ঠন রমজানের অন্যতম সুন্দর প্রতীক।

ফাতিমীয় খিলাফতের সময় থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য এখন পুরো শহরকে আলোয় ভরিয়ে দেয়।

রাস্তাঘাট এবং ঘরবাড়ি এই ফানুস দিয়ে সাজিয়ে পুরো দেশ এক উৎসবের আমেজ ধারণ করে।

৫. দক্ষিণ এশিয়ার চাঁদরাত

অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে রমজান শেষে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করে পালিত হয় ‘চাঁদরাত’।

মেহেদি উৎসব এবং শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় এই অঞ্চলগুলোতে প্রাণের সঞ্চার হয়।

৬. উপসাগরীয় দেশগুলোর হক আল লাইলা (Haq Al Laila)

রমজানের মাঝামাঝি সময়ে (১৫ই রমজান) শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি যায় এবং মিষ্টি ও উপহার সংগ্রহ করে।

৭. ইরাকের আল মুহাইবিস

রমজানের রাতে ইরাকিরা দলবদ্ধভাবে ঐতিহ্যবাহী আংটি লুকানোর খেলা ‘আল মুহাইবিস’ খেলে, যা সম্প্রতি ইরাকের নিজস্ব ঐতিহ্য তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

অন্যান্য ধর্মে রোজা ও উপবাসের পার্থক্য

রোজা বা উপবাস কেবল ইসলাম ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়।

খ্রিষ্টধর্মে ‘লেন্ট’ বা ৪০ দিনের উপবাস পালন করা হয়,

যেখানে তারা নির্দিষ্ট দিনে মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

হিন্দু ধর্মে একাদশী বা পূর্ণিমাতে উপবাসের রীতি রয়েছে।

ইহুদি ধর্মে ‘ইয়ম কিপ্পুর’ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উপবাসের দিন।

বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেও আত্মশুদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী উপবাসের প্রথা বিদ্যমান।

তবে মুসলিমদের রোজার সাথে অন্য ধর্মের মূল পার্থক্য হলো ‘সেহরি’ গ্রহণ

এবং সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে পূর্ণ বিরত থাকা।

যেভাবে ফরজ হলো ৩০ রোজা

মক্কা-মদিনায় ইসলাম প্রচারের আগেও আরবে রোজা রাখার প্রচলন ছিল।

নবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে।

এরপর তিনিও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে ৩০ দিন রোজা রাখি,

তা বাধ্যতামূলক বা ফরজ করা হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে)।

প্রথম দিকে নিয়ম ছিল এশার নামাজের পর থেকে আর কিছু খাওয়া যাবে না।

পরবর্তীতে সাহাবীদের কষ্ট হওয়ায় মহান আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহারের চূড়ান্ত বিধান নাজিল করেন।

বিবর্তনের ধারায় রোজার সময়সূচি ও রীতি

আদি যুগ

নবী নূহ (আ.) থেকে নবী ঈসা (আ.) পর্যন্ত অনেক নবীই মাসে ৩ দিন (আইয়ামুল বিজ) রোজা রাখতেন।

হিজরি ২য় বর্ষ

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার মাধ্যমে রমজান মাসব্যাপী রোজা ফরজ করা হয়।

খাদ্যাভ্যাস

সেই সময়ে সেহরি ও ইফতারে মূলত খেজুর, জমজমের পানি, উট বা দুম্বার দুধ এবং মাংসের প্রাধান্য ছিল।

ইউনেস্কো স্বীকৃত ইফতার ঐতিহ্য

পবিত্র রমজান মাস বিশ্বজুড়ে কেবল ধর্মীয় ইবাদতের সময় নয়,

বরং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো (UNESCO) মুসলমানদের ইফতার প্রথাকে অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ইরান, তুরস্ক, আজারবাইজান এবং উজবেকিস্তানের যৌথ আবেদনের প্রেক্ষিতে ইফতারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইউনেস্কোর মতে, ইফতার কেবল একটি খাবার নয়, বরং এটি সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, দানশীলতা এবং সংহতির প্রতীক।

সংস্কৃতির সেতুবন্ধন

রমজান আমাদের শেখায় ধৈর্য এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি।

দেশভেদে রীতি আলাদা হলেও সবার উদ্দেশ্য এক—পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি অর্জন।

কামানের শব্দ হোক কিংবা ঢোলের বাজনা,

এই বিচিত্র সংস্কৃতিগুলোই রমজানকে বিশ্বের দরবারে আরও রঙিন এবং অর্থবহ করে তুলেছে।

আপনার এলাকায় রমজানে বিশেষ কোনো ঐতিহ্যবাহী রীতি পালিত হয় কি? কমেন্টে জানান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *