গণআওয়াজ ডেস্ক
১২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক গণভোট: নতুন বাংলাদেশ নাকি সাংবিধানিক ঝুঁকি? একই দিনে নির্বাচন ও গণভোটের আদ্যোপান্ত
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় এই তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন দিন হিসেবে খোদাই হতে যাচ্ছে। একই দিনে, একই সময়ে দেশের ভোটাররা দুইবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন—একবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচনে, আর অন্যবার ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামক এক ঐতিহাসিক সংস্কার প্রস্তাবের ভাগ্য নির্ধারণে। এই প্রথম বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘গণভোট’। কিন্তু এই ‘ডাবল ভোট’ কি কেবলই সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের কৌশল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় কোনো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা? জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে অজস্র প্রশ্ন: কেন এই তাড়াহুড়ো? ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের সব কটি কি সাধারণ মানুষ জানে? নাকি একটি ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে অজানা কোনো দায়ভার কাঁধে নিতে যাচ্ছে দেশ?আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনের কথা এবং সাধারণ মানুষের জানা জরুরি এমন কিছু বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষণা অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দুটি আলাদা রঙের ব্যালট পেপার পাবেন। একটি ব্যালট হবে সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের জন্য, আর অন্যটি—একটি গোলাপি রঙের ব্যালট। সেখানে প্রশ্ন থাকবে—আপনি কি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন সমর্থন করেন? উত্তর হবে কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।
সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। তবে ইসি স্পষ্ট করেছে যে, কোনো ভোটার চাইলে কেবল সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, আবার চাইলে কেবল গণভোটে। একটিতে ভোট না দিলে অন্যটি বাতিল হবে না। এই প্রথমবারের মতো প্রবাসীরাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে একই সাথে দুটি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে বড় বিতর্কটি দানা বেঁধেছে ব্যালটের সংক্ষিপ্ত বয়ান নিয়ে। যেখানে সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে ৮৪টি, সেখানে ব্যালটে মাত্র চারটি মূল পয়েন্টের সারসংক্ষেপ থাকছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সামান্য তথ্যের ভিত্তিতে ভোটাররা কি পুরো সনদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন? সাধারণ ভোটারদের মনে একটি সূক্ষ্ম সংশয় কাজ করছে—দুটি ব্যালট একসাথে হওয়ায় ভোট দিতে গিয়ে কোনো ভুল হবে না তো? যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের ভোটাররা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও একাধিক ব্যালটে ভোট দিতে অভ্যস্ত, তাই এটি বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের স্পিরিট থেকে জন্ম নেওয়া গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা একটি সংস্কার রূপরেখা। এতে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতে, এই সনদ পাস হওয়া মানেই হলো ‘ফ্যাসিবাদ’ ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করা।
এই সনদের উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে—বাঙালি পরিচয়ের বদলে সাংবিধানিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে যুক্ত হবে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির বদলে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এমনকি জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বদলে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের সম্মতির বিধান রাখা হয়েছে। এই সনদের মূল লক্ষ্য হলো এমন এক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্র আধিপত্য বা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। যেমন—প্রধানমন্ত্রী চাইলেই একক সিদ্ধান্তে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন না, সেখানে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের সম্মতির প্রয়োজন হবে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশন গঠনেও বড় ধরনের স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাব রয়েছে এই সনদে। যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এই ৮৪টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য থাকবে। আর যদি ‘না’ জয়ী হয়, তবে পুরো সনদটিই বাতিল হয়ে যাবে।
গণভোটের প্রচারণা ঘিরে এখন দেশজুড়ে বইছে বিতর্কের ঝড়। সরকারি অফিস, বিলবোর্ড, টেলিভিশন চ্যানেল থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা দেখা যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—গণতন্ত্রে কি কেবল একপক্ষের প্রচারণার সুযোগ থাকা উচিত?
সম্প্রতি বিভিন্ন সেমিনার ও গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ভোটাররা যদি না জেনেই কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, তবে সেটি প্রকৃত জনমত হবে না। সমালোচকদের মতে, ব্যালটে মাত্র কয়েকটি পয়েন্টের সারসংক্ষেপ থাকবে, যা পড়ে পুরো সনদের প্রভাব বোঝা কঠিন।সংস্কারের বিষয়গুলো জনগণের কাছে আরও সহজভাবে পৌঁছানো দরকার ছিল। কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণার চেয়ে প্রতিটি সংস্কারের সুফল এবং প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলে সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো। কারণ একবার ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে, পরবর্তী যেকোনো নির্বাচিত সরকার এই সনদ বাস্তবায়নে আইনিভাবে বাধ্য থাকবে।এদিকে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে নিষেধ করলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া ‘সব নয় কিছুই নয়’ (All or Nothing) পদ্ধতিতে এই ভোট আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে ভোটারদের নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জন করার সুযোগ নেই—হয় পুরো ৮৪টি প্রস্তাব মানতে হবে, নয়তো সব বাতিল।
বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে এবং ১৯৮৫ সালে এইচ এম এরশাদের আমলে হওয়া গণভোটগুলোর বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন ছিল। তবে ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদীয় পদ্ধতি ফেরানোর প্রশ্নে হওয়া তৃতীয় গণভোটটি তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৯১ সালের পর সংবিধান থেকে এই বিধানটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।।২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিল করলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টের রায়ে এটি পুনরায় ফিরে আসে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করেন, একই দিনে দুই ভোট আয়োজনে অর্থ সাশ্রয় হলেও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে ভোটাররা তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন। পুরানো গণভোটগুলোর সাথে এবারের পার্থক্য হলো—আগে গণভোটগুলো হয়েছিল মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তির শাসনকে বৈধতা দিতে। কিন্তু এবারের গণভোট হচ্ছে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার বা সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য। ফলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট দূর না হলে এই গণভোটও ভবিষ্যতের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল সরকার পরিবর্তনের ভোট নয়, এটি রাষ্ট্র মেরামতের কাঠামোগত পরিবর্তনের ভোট। আপনি যখন গোলাপি ব্যালটে সীল দেবেন, তখন মনে রাখবেন আপনি কেবল একটি সংস্কারকে সমর্থন করছেন না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থার অনুমোদন দিচ্ছেন। তাই আবেগ নয়, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে নাগরিক দায়িত্ব। ভোটার হিসেবে দায়িত্ব কেবল ভোট দেওয়া নয়, বরং কীসে ভোট দিচ্ছি তা বুঝে নেওয়া। আবেগ আর হুজুগের চেয়ে সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে প্রকৃত নাগরিক দায়িত্ব।
এই গণভোট সফল হলে বাংলাদেশ হয়তো এক নতুন প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক যুগে প্রবেশ করবে। তবে সেই পথ যেন স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? কমেন্টে জানান!
