ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে প্রথমবারের মতো একজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতির খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানিকে বুধবার ফাঁসি দেওয়া হতে পারে। তাকে গত সপ্তাহে কারাজ শহরে চলমান বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) এবং ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্র্যাসি ইন ইরানের (NUFDI) বরাতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তার পরিবারকে জানানো হয় যে এরফানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ১৪ জানুয়ারি তা কার্যকর হতে পারে। সংগঠনগুলো দাবি করছে, গ্রেপ্তারের পর তাকে যথাযথ আইনি সহায়তা বা স্বাধীন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এক বিবৃতিতে বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ১৯৮০-এর দশকের মানবতাবিরোধী অপরাধের স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত ও গণহারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এরফান সোলতানির বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ (মোহরেবেহ) অভিযোগ, যা ইরানের দণ্ডবিধিতে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত থাকায় এসব অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সময়ে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। যদিও এসব সংখ্যার সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার বিষয়ে কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সহায়তার জন্য প্রস্তুত। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, কূটনীতি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ হলেও পরিস্থিতির সব দিক বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সামরিক হুমকি নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। কংগ্রেসের একাধিক আইনপ্রণেতা বলেছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া সংবিধানসম্মত নয় এবং এমন পদক্ষেপ উল্টো ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারে।
এদিকে ইরান সরকারও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান পূর্ণমাত্রার প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং আঞ্চলিকভাবে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, এরফান সোলতানির সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড ইরানের চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার জীবন রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এখন দৃষ্টি পুরো বিশ্বের—এই দণ্ড কার্যকর হয় কি না এবং এর প্রভাব ইরানের ভেতরের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়।
