বিশেষ প্রতিবেদক | গণ আওয়াজ
ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাথে নতুন চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরিতে দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে সরকার। পূর্ববর্তী কর্মসূচির কঠোর ও দ্রুত সংস্কারের বদলে এবার ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৫ থেকে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুতেই (২০২৭ সালের জানুয়ারি) এই নতুন ঋণ চুক্তিটি অনুমোদনের জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
চুক্তির প্রেক্ষাপট ও পরিধি
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের চলমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের পূর্ববর্তী ঋণ কর্মসূচির বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নমনীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর অনুরোধ জানিয়েছে।
- ঋণের আনুমানিক পরিমাণ: ৫ থেকে ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- মেয়াদ: ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদি নতুন সংস্কার কর্মসূচি।
- চূড়ান্তকরণের সম্ভাব্য সময়: সরকারের লক্ষ্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত করা এবং আগামী বছরের জানুয়ারিতে আইএমএফ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া।
আইএমএফের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের মিশন প্রধানদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কেন এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি?
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগের ঋণ কর্মসূচিতে রাজস্ব আদায় ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর মতো এককালীন কঠোর কিছু শর্ত ছিল, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল।
কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন সূত্রে অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, এবারের চুক্তিতে সরকার এবং আইএমএফ উভয় পক্ষই “বাস্তবসম্মত ও পর্যায়ক্রমিক” (realistic and phased) সংস্কার কর্মসূচির ওপর একমত হয়েছে। কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন কর্মসূচির প্রধান ৪টি স্তম্ভ
১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণ (NPL) কমানো, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন।
২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রানীতি: খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে নমনীয় কিন্তু কার্যকর সুদের হার নীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা।
৩. রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি: এনবিআরের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রুখতে অটোমেশন চালুর পরিকল্পনা।
৪. ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা: সামাজিক সুরক্ষা খাত বজায় রেখে অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে হ্রাস করা।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতির মুখে আইএমএফের এই নতুন সহায়তা বাজেট সহায়তা হিসেবে বড় স্বস্তি এনে দেবে। এটি শুধু সরাসরি ডলার প্রবাহই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর (যেমন বিশ্বব্যাংক ও এডিবি) কাছ থেকেও বাড়তি অর্থায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিসেম্বরে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপরেখা কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
